গত ৬ আগস্ট, ২০২৪ রাষ্ট্রপতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিধি ও প্রয়োগ সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে নিয়ন্ত্রিত হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান, স্থগিত এবং প্রয়োজনে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে এই ক্ষমতা অর্পণ করেছে। যদি ৭২(১) অনুচ্ছেদ এখানেই শেষ হত তাহলে আর কোনো বিতর্ক থাকত না। কিন্তু ৭২(১) অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় শর্তে উল্লেখ আছে যে “এই দফার অধীন তাঁহার দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক লিখিতভাবে প্রদত্ত পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।” অর্থাৎ ৭২(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে সংসদ আহ্বান,স্থগিত ও ভঙ্গ করার ক্ষমতা দিয়েছে কিন্তু তিনি এ কাজগুলো করতে পারবেন যদি প্রধানমন্ত্রী তাঁকে এই কাজ করার লিখিতভাবে পরামর্শ দেন অন্যথায় নয়।
এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ নিতে বাধ্য কি না। সাধারণভাবে এর উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ। কারণ আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার প্রয়োগ ও পরিধি সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে নিয়ন্ত্রিত হয়। ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে “এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন।” বর্ণিত বিধানটি নির্দেশ করে যে, রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে শুধুমাত্র দুটি কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া করতে পারেন। একটি হলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ অন্যটি হলো প্রধান বিচারপতির নিয়োগ। তবে বাস্তবতা হলো, এই দুই ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি আসলে স্বাধীন নন। রাষ্ট্রপতি চাইলেই তাঁর পছন্দসই ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন না, এক্ষেত্রেও শর্ত আছে। ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বলা আছে যে, রাষ্ট্রপতি তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন যিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন অর্থাৎ যাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন তিনি সেই দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিকট আস্থাভাজন বলে গণ্য হবেন। ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো শর্ত না থাকলেও সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধান বিচারপতির পদটি সরকারের নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাস্তবে এক্ষেত্রে সরকারের পরামর্শের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উপর্যু্ক্ত আলোচনা হতে প্রতীয়মান হয় যে, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পূর্বে অবশ্যই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ নিয়ে সংসদ ভেঙে দেন নি। এ কারণে অনেকেই প্রশ্ন করেন, রাষ্ট্রপতি একা একা সংসদ ভেঙে দিতে পারেন কি না বা রাষ্ট্রপতি ভেঙে দিলেই সংসদ আসলেই বিলুপ্ত হয়েছে কি না।
তাদের প্রশ্নের জবাব হলো, প্রধানমন্ত্রীর লিখিত বা অলিখিত পরামর্শ নেওয়ার বিধানটি তখনই প্রযোজ্য হবে যখন প্রধানমন্ত্রী তাঁর দায়িত্বে থাকবেন। রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিয়েছেন ৬ আগস্ট, ২০২৪। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগ করেছেন ৫ আগস্ট, ২০২৪। তিনি পদত্যাগ করে দেশেও ছিলেন না, প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিকটজন সহ ভারতের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন। তাই বাস্তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ বা বাধ্যবাধকতা কোনোটিই রাষ্ট্রপতির নেই।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, কেউ আদালতে যেয়ে চ্যালেঞ্জ করলে রাষ্ট্রপতির এই প্রজ্ঞাপনটি বাতিল হবে কি না বা আদালত অবৈধ ঘোষণা করে আগের সংসদকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন কি না। সহজ উত্তর হলো কেউ চাইলে আদালতে যেতে পারবে, কিন্তু তার আবেদন আদালতে রক্ষনীয় (গ্রহণযোগ্য) হবে না। কারণ ৪৮ অনুচ্ছেদের (৩) দফার শর্তে উল্লেখ আছে যে “তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনো পরামর্শদান করিয়াছেন কি না এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোনো আদালত সেই সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।” অতএব বর্ণিত আলোচনা আমাদের নিকট স্পষ্ট করে যে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ যথার্থভাবেই বিলুপ্ত হয়েছে এবং এই বিলুপ্তির ক্ষেত্রে আদালত কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর পূর্বে কোনো প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেননি। তাই এ বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতের ও কোনো নজির নেই।
এরপরেও রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেওয়ার পূর্বে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতির জন্য সার-সংক্ষেপ’ শিরোনামে ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভাংগিয়া দেওয়া প্রসঙ্গে’ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির নিকট সার-সংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়। যেখানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার আইনি বিষয় বর্ণনা করা হয়। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো-
“১। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৭ জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ জানুয়ারি, ২০২৪ তারিখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র প্রদান করে দেশ ত্যাগ করেন।
২. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে (সংলাগ-১) বিধান রয়েছে যে, ‘এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করবেন।
তবে শর্ত থাকে যে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনও পরামর্শদান করেছেন কিনা এবং করে থাকলে কী পরামর্শ দান করেছেন, কোনো আদালত সেই সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের তদন্ত করতে পারবেন না।’
৩. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করায় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তার সঙ্গে পরামর্শ গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। তাই সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলা, জনস্বার্থ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন যাতে বিপদের সম্মুখীন না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রপতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের অধীন তার বিচক্ষণতা (ডিসক্রিশনারি পাওয়ার) /সহজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে পারেন।
৪. রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬-এর শিডিউল ফোর (সংলাগ-২)-এর অধীন জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন সংসদ সচিবালয়ের কর্মপরিধিভুক্ত। যেহেতু তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন, সেহেতু রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬-এর রুল ৩৩ (সংলাগ-৩)-এর আওতায় জনস্বার্থে, রাষ্ট্রপতি অনুচ্ছেদ ৩-এ বর্ণিত অবস্থাধীনে সমীচীন বিবেচনায় সেহেতু রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬-এর শিডিউল ফোর এর ব্যতিক্রম সদয় অনুমোদনপূর্বক দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞপ্তি (পতাকা-ক) জারি করতে পারেন।
৫. অনুচ্ছেদ ৪-এর প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির সানুগ্রহ বিবেচনা এবং অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
লেখক:
আরিফুল ইসলাম
সহকারী অধ্যাপক, আইন ও বিচার বিভাগ;
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, (বিইউবিটি)।
Leave a Reply