(অষ্টম কিস্তি)
২০২৩ সালের ঘটনা। তখন আমি প্রত্যেক বৃহস্পতিবার আমার হাইকোর্টের সিনিয়র লার্নেড অ্যাডভোকেটের সাথে কোর্টে যেতাম। আমি শনিবার সন্ধ্যায় এলএলএম (মাস্টার্স) শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতাম, বিনিময়ে বৃহস্পতিবার কর্মদিবসে ছুটি পেতাম। ওই দিনটা কোর্টের জন্য বরাদ্দ থাকত। কোর্টে যেতে যেতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়, যাদের অনেকের লেখাপড়া আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই শেষ হয়। তেমন এক বড় ভাইয়ের চেম্বার সুপ্রিম কোর্টের শেরেবাংলা ভবনে। আমার সিনিয়রের চেম্বারও শেরেবাংলা ভবনে হওয়ায় মাঝে মাঝে ভাইয়ের সাথে দেখা হত। ভাই আমাকে খুব স্নেহ করতেন, অনেক সময় চেম্বারে ডেকে কফি খেতে খেতে গল্প করতেন। ভাইয়ের সাথে আন্তরিকতার আরেকটি কারণ, তাঁর আপন ভাগ্নি বিইউবিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করত।
একদিন আমি সাড়ে তিনটা থেকে চারটার দিকে সিনিয়রের কাজ শেষ করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে দিয়ে বের হচ্ছি, এমন সময় ওই বড় ভাইয়ের সাথে আমার দেখা; ভাই কোর্ট শেষ করে চেম্বারে যাচ্ছেন। আমাকে দেখে ভাই নিজেই ডাক দিলেন। কুশল বিনিময়ের পরে বললেন, চেম্বারে চল, আমার এক বন্ধু এসেছে, ও যুগ্ম জেলা জজ, তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। যদিও আমার ব্যস্ততা ছিল, তবুও ভাইয়ের কথায় না করতে পারিনি। তাঁকে অনুসরণ করে লিফট ধরে ভাইয়ের চেম্বারে পৌঁছলাম। চেম্বারে পৌঁছে নিজেই তাঁর বন্ধুর সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ভাই তখন লক্ষ্মীপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চতুর্থ বিজেএস পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ বিচার বিভাগে যোগদান করেন।
তাঁরা দুই-তিন বন্ধু সন্ধ্যায় একটা পারিবারিক প্রোগ্রামে যাবেন বলে সবার এই চেম্বারে একত্র হওয়ার কথা রয়েছে। আইনজীবী বড় ভাই তাঁর চেম্বারের ছেলেটিকে দিয়ে গরম গরম সিঙ্গারা আর কফি আনালেন। গল্পে গল্পে জানতে পারলাম, তাঁরা দুই বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একই হলের একই রুমে থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে ঢাকায় এসেও ফার্মগেটে একই মেসে থাকতেন। আমি কথার মাঝে বললাম, ভাই, কিছু মনে করবেন না, একটা বিষয় জানার জন্য জিজ্ঞেস করি — আপনার বন্ধু জজ, আপনি কি জজের পরীক্ষা দেননি? ভাই হাসতে হাসতে বললেন, সে এক মজার ইতিহাস। বিষয়টি কাকতালীয় হলেও, এ বিষয় নিয়ে আমাদের একটা মজার গল্প আছে। আমি বললাম, বলুন। ভাই শুরু করলেন,
“আমাদের যখন মাস্টার্স শেষ হয়, তখন ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দীনের সরকার ক্ষমতায়। ২০০৭ সালের নভেম্বরে বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক হয়। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে আমাদের মাস্টার্সের ভাইবা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সপ্তাহখানেক পরে ক্যাম্পাস ছেড়ে চাকরির প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসার পূর্বে সকল শিক্ষকমণ্ডলী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ পর্বে আমাদের সকলের প্রিয় একজন শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকের দোয়া নিতে তাঁর চেম্বারে যাই। বিদায় বেলায় স্যার জানতে চাইলেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে কী পরিকল্পনা করেছি। আমরা দুজনেই বললাম, যেহেতু বিচার বিভাগ পৃথক হয়েছে, সামনে বিজেএস পরীক্ষা আছে, ইচ্ছা আছে সুযোগ পেলে বিচার বিভাগে যোগ দেওয়ার। একপর্যায়ে স্যারের কাছে জানতে চাইলাম, এ বিষয়ে আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি না? স্যার হাসতে হাসতে বললেন,
‘বাপু শোন, যদি এটাই তোদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে তোদের জন্য দোয়া রইল। আর যদি আমার কাছে পরামর্শ চাস, তাহলে আমি তোকে (এখন আইনজীবী) বলব, তুই উকিল হ। আর তুই (এখন বিচারক) পরীক্ষা দিয়ে বিচার বিভাগে যা। কারণ আমার মতে, তুই (বর্তমানে আইনজীবী) যতটা বলতে পারিস, ঠিক ততটা পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারিস না। আর তুই (বর্তমানে বিচারক) খাতায় যেভাবে চমৎকার করে লিখতে পারিস, বলার ক্ষেত্রে ততটা পারিস না। আমার মনে হয়, তোরা দুজন দুই পেশায় ভালো করবি।’
বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক ও স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পরদিন সকালে এসবি পরিবহনে আমরা দুই বন্ধু ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ঢাকায় এসে বড় ভাইদের সাথে ফার্মগেটে মেসে উঠলাম। তখন বিজেএসের জন্য আলাদা তেমন কোনো কোচিং ছিল না, ক্যারিয়ার এইড নামে একটা কোচিং বিসিএসের পাশাপাশি আইনের ছাত্রদের বিজেএসের জন্য অল্প কিছু পড়াত। আমরা সেখানে ভর্তি হলাম। ২০০৮ সালে তৃতীয় বিজেএস পরীক্ষায় নামমাত্র অংশগ্রহণ করলাম, কেউই ভালো করতে পারলাম না। চতুর্থ বিজেএস-এ ও (বিচারকের দিকে তাকিয়ে) জজ হয়ে গেল। আমি লিখিত পরীক্ষায় খারাপ করলাম, ভাইবায় রোল এল না। আমি এবার কোনো কোচিং না করে নিজে নিজে পঞ্চম বিজেএস পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলাম। বার কাউন্সিল পরীক্ষার জন্য ইন্টিমেশন জমা দিব দিব করে দেওয়া হয়নি, সেটাও দিয়ে ফেললাম। যথারীতি পঞ্চম বিজেএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারি পর্বে পাস করে লিখিত পরীক্ষা দিলাম। এবারও ভাইবা তালিকায় নাম না দেখে হতাশ হলাম। ইতিমধ্যে ও (বিচারক) কিশোরগঞ্জে জয়েন করে ফেলল। আমার লিখিত পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ায় সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, বিজেএস পরীক্ষাও আর দেব না, এমনকি অন্য কোনো সরকারি চাকরির পরীক্ষাও দেব না। মনে পড়ল স্যারের সেই বিদায়ের দিনের কথা, ‘তুই যতটা বলতে পারিস, ঠিক ততটা খাতায় লিখতে পারিস না।’ আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বার কাউন্সিলের পরীক্ষাটা ভালো করে দেব, দেখি আইনজীবী হওয়া যায় কি না। ২০১১ সালে পরীক্ষা দিলাম এবং একবারে আইনজীবী হয়ে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, কারও সঙ্গে হাইকোর্টেই প্র্যাকটিস শুরু করব। যেই কথা সেই কাজ, তখন থেকেই আমার সিনিয়র স্যারের সাথে এই চেম্বারে আছি।
জজ না হতে পারলেও, জজের পরীক্ষা দেওয়ার কারণে আইনগুলো ভালো পড়া ছিল বলে ওকালতি জীবনে খুব উপকার হয়েছে। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে স্যার যা বলেছিলেন, আমাদের দুজনের পেশাগত জীবনে সেটাই ঘটেছে। তবে বিজেএস দিয়ে জজ হওয়ার সিদ্ধান্তটা কিন্তু আমি কয়েকজনের সঙ্গে পরামর্শ করেই নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হয়, আমি যদি ঢাকায় এসেই স্যারের কথামতো তখনই কোনো সিনিয়রের সঙ্গে কাজ শুরু করে দিতাম, তাহলে পেশাগত জীবনে অন্তত তিন বছরের সিনিয়র থাকতাম। স্যারও তখন সিরিয়াসলি বলেননি, আর আমিও তাঁর কথাকে গুরুত্ব দিইনি, যে কারণে আইন পেশায় আমি আমার সমবয়সীদের চেয়ে প্রায় তিন বছর পিছিয়ে গেছি।”
আমি ভাইদের সাথে কথা শেষ করে মেট্রো ধরে বাসায় চলে এলাম। কিন্তু মনে হলো, ভাইয়ের ওই কথাটা আমার কানে বাজছে, “যে কারণে আইন পেশায় আমি আমার সমবয়সীদের চেয়ে তিন বছর পিছিয়ে গেছি।” আমার কাছেও কথাটা ঠিক মনে হয়েছে। আমরা অনেকেই কর্মজীবনে প্রবেশের পূর্বে পেশা পছন্দের ক্ষেত্রে অনেকের পরামর্শ নিই। অথবা কেউ কেউ নিই না, পরিবার ঠিক করে দেয় অথবা নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। কিন্তু যাঁরা অন্যের পরামর্শ নেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই পেশা পছন্দের ক্ষেত্রে তাঁর শ্রেণিশিক্ষকের পরামর্শ নেন না। তাই আমার কাছে মনে হয়, ভবিষ্যতের পেশা পছন্দের ক্ষেত্রে শ্রেণিশিক্ষকের পরামর্শ না নেওয়া একটা ভুল। আপনি আপনার নিজের সঙ্গে কথা বলুন — ভবিষ্যৎ পেশা সম্পর্কে আপনার বিবেক কী বলে সেটা বিবেচনায় নিন, যে পেশায় যেতে চান সেই পেশার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিন, প্রয়োজনে ক্যারিয়ার কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন, অথবা বাবা-মা থাকলে তাঁদের পরামর্শ নিন; কিন্তু আমি বলব, ওপরের যাঁর পরামর্শই নেন না কেন, আপনি যখন থেকেই ভবিষ্যতের পেশা নিয়ে ভাবছেন অথবা লেখাপড়া শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের পূর্বে যেসব সম্মানিত শিক্ষক আপনাকে পড়িয়েছেন, আপনার পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেছেন, এরকম দু-চারজন শিক্ষকের সাথে আপনার ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে পরামর্শ করুন। আপনাকে অনেকে অনেক ধরনের পরামর্শ দিতে পারবে, কিন্তু তারা বাস্তবে অনেকেই আপনার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। কিন্তু আপনার যিনি শ্রেণিশিক্ষক, এক বা একাধিক কোর্স পড়িয়েছেন, আপনার খাতাকে মূল্যায়ন করেছেন, তিনি আপনাকে বাস্তবধর্মী পরামর্শ দিতে পারবেন। কারণ বিভাগের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে থাকেন। তাঁরা আপনার মেধাকে মূল্যায়ন করতে পারেন, ব্যতিক্রম ছাড়া আপনার লেখার মান সম্পর্কে তাঁদের স্বচ্ছ ধারণা থাকে। সে কারণে বর্তমান চাকরির বাজার ও প্রতিযোগিতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থেকে যদি আপনার শিক্ষক আপনাকে পরামর্শ দেন, সেই পরামর্শ অন্যদের থেকে ভিন্ন হবে — এটা নিশ্চিত থাকতে পারেন।
তাই আইনে পড়ুয়াদের প্রতি আমার পরামর্শ, যদি নিজের ভবিষ্যৎ পেশা আপনি নিশ্চিত করে থাকেন, সেক্ষেত্রে কথা ভিন্ন, কিন্তু যদি আপনি আপনার পেশার ব্যাপারে কারও পরামর্শ নেন, অবশ্যই আপনার এক বা একাধিক শ্রেণিশিক্ষকের পরামর্শ নিবেন। আমি নিশ্চিত, এক্ষেত্রে আপনি অন্যদের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে থাকবেন।
সকলের জন্য শুভকামনা রইল। (চলবে)
লেখক: আরিফুল ইসলাম
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
আইন ও বিচার বিভাগ, বিইউবিটি।
Leave a Reply