তিনি আমার বিভাগের বড় ভাই, ৫ ব্যাচ সিনিয়র। সত্যি বলতে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। কর্মজীবনে এসে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ও আন্তরিকতা তৈরি হয়। পরে জেনেছি, বড় ভাই তাঁর ব্যাচের সব শিক্ষার্থীর মধ্যে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে সফল। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা, আইন বই লেখা, কোম্পানির আইন পরামর্শক ও কোর্ট প্র্যাকটিস—সবকিছুই ভাই সমানতালে চালিয়ে যেতেন। যার ফলে তাঁর বন্ধুদের অনেকেই যখন নিজে প্রতিষ্ঠিতই হতে পারেনি, তিনি ততদিনে ঢাকায় নিজে ১ তলা বাড়ি করে ফেলেছেন।
আজকের আলোচনার বিষয় এটি নয়, মূল আলোচনায় ফিরে আসি। আমার সঙ্গে পরিচয়ের কয়েক বছর পরে ভাই শিক্ষকতা পেশা বাদ দিয়ে পুরোপুরি আইন পেশায় মনোনিবেশ করলেন। বছরখানেক পরে ভাই একদিন আমাকে ফোন করে কুশলাদি বিনিময়ের পরে বললেন, “আরিফ, আমার চেম্বারে একজন জুনিয়র দরকার। যে ছেলেটা ছিল, সে একটা কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে, ও আর ঢাকায় থাকবে না। পারলে আমাকে একটা ভালো ছেলে দাও। বার কাউন্সিলের লাইসেন্স থাকলে ভালো হয়, তবে না থাকলেও চলবে। কিন্তু কম্পিউটারের বেসিক ট্রেনিং থাকতে হবে, বিশেষত বাংলা ও ইংরেজি ভালো টাইপিং জানতে হবে।”
আমি চেষ্টা করব বলে আশ্বাস দিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে কথা শেষ করলাম। সবশেষ পরীক্ষায় যাঁরা বার কাউন্সিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, আমার পরিচিত কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। যেহেতু গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে, ইন্টিমেশন (শিক্ষানবিশ শুরু হওয়ার অবহিতকরণপত্র) জমা দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, চূড়ান্তভাবে বার কাউন্সিলের সনদ পেতে বেশির ভাগ সময় প্রায় দুই বছর লেগে যায়। তাই যারা সনদ পেয়েছে, তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন চেম্বারে কাজ শুরু করে দিয়েছে অথবা অন্য চাকরিতে যোগ দিয়েছে।
আমি সনদপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে ভাইয়ের চেম্বারে দেওয়ার জন্য কাউকে পেলাম না। শেষে আমি সদ্য গ্র্যাজুয়েট, যাঁরা শিক্ষানবিশ হিসেবে কোর্টে আসা-যাওয়া শুরু করেছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলাম। তাঁদের কয়েকজন আগ্রহ দেখালেন, কিন্তু অধিকাংশই বাংলা-ইংরেজি টাইপিংয়ে দক্ষ নন। দু-একজন ইংরেজি টাইপ করতে পারেন, কিন্তু কম্পিউটারের বেসিক জ্ঞান নেই। প্রথম বর্ষে কম্পিউটারের জন্য যে কোর্সটি পড়েছিল, পরে আর চর্চা না থাকায় অনেক কিছুই ভুলে গেছে। আবার এমন কয়েকজন পেলাম, যাদের কম্পিউটার লিটারেসি আছে, কিন্তু এখনই কোনো চেম্বারে যুক্ত হবে না।
সব মিলিয়ে ভাইয়ের চাহিদামতো একজন জুনিয়র ভাইয়ের চেম্বারে দিতে ব্যর্থ হলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সময় আমার এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কোর্টে প্র্যাকটিস করতে চাচ্ছেন, অথচ কম্পিউটারটা ভালো করে শিখলেন না, টাইপিংটা পারছেন না—ছাত্রজীবনে এগুলো শিখলে ভালো হতো না?”
আমার শিক্ষার্থীর সরল উত্তর, “কোর্টে গেলে যে কম্পিউটারের কাজটা ভালো জানলে চেম্বার পাওয়া সহজ হবে, এটা ছাত্রজীবনে বুঝতে পারিনি। তাই পাস করার জন্য যতটুকু দরকার, পড়েছি; কিন্তু সেই চর্চাটা ধরে রাখিনি।”
এবার আমি আপনাদেরকে আমার অন্য একজন শিক্ষার্থীর গল্প শোনাই। আমার শিক্ষকতা জীবনে পাওয়া কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্যে সে অন্যতম। অসাধারণ ফলাফলের জন্য সে গোল্ড মেডেলপ্রাপ্ত। এখন সে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
ছাত্রজীবনে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সে বিভাগের মুট কোর্টের সক্রিয় সদস্য ছিল। আইনের শিক্ষার্থীরা জানেন, একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি মুটিংয়ের গুরুত্ব কত! সে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুট কোর্টের সদস্য হিসেবে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে এবং মুট কোর্ট সোসাইটিকে নেতৃত্ব দিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কারণে সাংবিধানিক আইন, আন্তর্জাতিক আইন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনগুলোকে তাকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা যেহেতু ইংরেজিতে হয়, সেহেতু তাকে ইংরেজিটাও দারুণভাবে শিখতে হয়েছে। আর দিয়েছে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন।
শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কয়েক মাস পর একদিন ক্যাম্পাসে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। তাকে নিয়ে ক্যাফেটেরিয়ায় কফি খেতে গেলাম। কফি খেতে খেতে তার গল্প শুনছিলাম। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো, তারা একটি পদের বিপরীতে প্রায় ২০ জন লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিল। ভাইভায় অংশগ্রহণ করেছিল ১২ জন। পরবর্তীতে সে বিভাগীয় প্রধানের কাছে শুনেছে, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার নম্বরে তার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। যিনি প্রথম হয়েছেন, তাঁর সঙ্গে খুব কম নম্বরের ব্যবধান।
কিন্তু তাঁদের একজন শিক্ষকের পাশাপাশি একজন মুটারও দরকার ছিল। যিনি পড়াশোনা করানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মুটের প্রশিক্ষণও দিতে পারবেন। পরীক্ষায় যিনি প্রথম হয়েছিলেন, তিনি অসাধারণ মেধাবী হলেও মুটার ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সিভিতে মুটিংয়ের অভিজ্ঞতাসহ কয়েকটি সার্টিফিকেট থাকায় ওই পদে তাঁকে বিবেচনা করেন। এখন সে মুট কোর্টের মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। যেদিন তাকে মুট কোর্টের মডারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, সেদিন বিভাগীয় প্রধান এ কথাগুলো তাকে বলেছিলেন।
আমার কাছে সে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছে এই বলে যে, সে মুট কোর্টে যুক্ত হওয়ার আগে আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ নিতে এসেছিল—একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সে এখানে যুক্ত হবে কি না, না এতে কী তার পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হবে? আমি তাকে নির্দ্বিধায় মুট কোর্টে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলাম। এখন তার মনে হচ্ছে, এটা ছিল তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, আপনারা যারা আমার এই লেখার চতুর্থ কিস্তি পড়েছেন, তারা জানেন জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমি কী লিখেছিলাম। আমার এই শিক্ষার্থীর শিক্ষক হওয়ার লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু তিনি শিক্ষক হয়ে গেলেন। এক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, অর্থাৎ মুটিং, তাকে অনেকটা সহায়তা করেছে।
লেখার শেষ প্রান্তে এসে, আমার মনে হচ্ছে আইনে পড়ুয়াদের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেই পেশার সঙ্গে আর কোন কোন বিষয়গুলো জানা থাকলে ঐ পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, সেগুলো না জানা একটা ভুল।
আপনি যখন আপনার জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন, তখন সেই পেশার সফল ব্যক্তিদের কাছে জেনে নেবেন যে, আমি এই পেশায় যেতে চাই; আমার একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি আর কোন বিষয়গুলো শিখলে সেক্ষেত্রে এই পেশায় আসার ক্ষেত্রে আমার জন্য সহায়ক হবে। সেগুলো জেনে যদি আপনি ছাত্রজীবনেই নিজেকে প্রস্তুত করেন, তাহলে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পরে আপনাকে খুব বেশিদিন বেকার থাকতে হবে না।
একটা গল্প বলে লেখাটা শেষ করছি—ধরুন, আপনি একটি ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক। আপনার দলে আর একজন খেলোয়াড় দরকার। তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করতে হবে। তিনজনের একজন ব্যাটসম্যান, একজন বোলার এবং অন্যজন অলরাউন্ডার। অলরাউন্ডার খেলোয়াড় ব্যাটে-বলে সমান পারদর্শী। এখন চিন্তা করুন, দলের স্বার্থে আপনি কাকে দলে নেবেন। একজনকে দিয়ে যদি আপনি একই সময় একাধিক সুবিধা পান, তাহলে আপনি তাকেই দলে নেবেন।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ে নিজেকে দক্ষ করে তোলা। আপনার এই বিশেষ দক্ষতাই অন্যদের থেকে আপনাকে এগিয়ে দেবে।
সকলের জন্য শুভকামনা রইল। (চলবে)
লেখক: আরিফুল ইসলাম
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
আইন ও বিচার বিভাগ, বিইউবিটি।
Leave a Reply