আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবন ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। (সেশন জ্যামের কারণে পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবন আট বছরে গিয়ে পৌঁছেছিল, সে কথা আগেই বলেছি।) বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে শুধু ছাত্র পরিচয়ের বাইরেও আমার আরেকটি পরিচয় ছিল, সেটি হলো বিতার্কিক (অনেকেই ভুল করে পড়ে বিতর্কিত – হা হা)। আমি বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে অনেক এক্সট্রাকারিকুলারের মধ্য হতে বিতর্ককে বেছে নিয়েছিলাম। ২০১২ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় বিতার্কিক দলের নিয়মিত সদস্য ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে সমসাময়িক সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি, অংশগ্রহণ করেছি অসংখ্য টিভি বিতর্কে। বিতার্কিক হিসেবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃহল বিতর্কে ২০১৪ সালে সেরা বিতার্কিক নির্বাচিত হয়েছিলাম এবং সংগঠক হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমান হল ডিবেটিং সোসাইটির (ZHDS) সভাপতি ও ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির (IUDS) যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে আমি কী করেছি সেটি আজকের আলোচনার বিষয় নয়, আলোচনার বিষয় হলো একটি আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও বিতার্কিক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্কে অংশগ্রহণ করে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, তার একটি বিষয় নিয়ে।
আমরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিক দল হিসেবে বিভিন্ন টিভি বিতর্কে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখোমুখি হয়েছি কয়েকবার। সাধারণত বিতর্ক যেদিন রেকর্ড করা হবে তার ১৫ থেকে ২০ দিন পূর্বে বিতর্কের বিষয় ও দলের অবস্থান জানিয়ে চিঠি পাঠানো হত। আমরা সবাই মিলে বড় ভাইদের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চর্চা করে দল গঠন করে নির্ধারিত দিনের আগের দিনে ঢাকায় পৌঁছে যেতাম। প্রথমদিকে মঞ্চে বিতার্কিক হিসেবে নয়, দলের উদীয়মান তরুণ বিতার্কিক হিসেবে দলে থাকতাম। অন্য দলের বিতার্কিকদের সাথে পরিচয় হত, কথা হত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।
একবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বিতর্কের সময় দেখলাম, যার বিতর্ক করার কথা সে কোনো একটি কারণে নির্ধারিত সময়ে আসতে পারেনি। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মোঃ আজিজুল ইসলাম উপস্থিত হয়েছেন, তাই আয়োজকরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে রাজি হলেন না, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে তাঁর স্থানে অন্য একজন বিতার্কিক, যিনি সাধারণ সদস্য হিসেবে দলে এসেছিলেন, বিতর্ক করলেন এবং তাঁরা বিতর্কে আমাদের হারিয়ে জয়ী হলেন। বিতর্ক শেষে আমি অবাক হলাম যে, আমরা দল হিসেবে প্রায় ২০ দিনের মতো পরিশ্রম করে প্রস্তুতি নিয়ে মঞ্চে বিতর্ক করে হেরে গেলাম, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের বিতর্ক দলে যিনি সরকারি দলের মন্ত্রী হিসেবে বক্তব্য রাখলেন, তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে দলে যুক্ত হয়েও দারুণ বক্তব্য রাখলেন।
বিতর্ক চলাকালে আমি লক্ষ করলাম, আমার দলের তিনজন বিতার্কিকের মধ্যে দু-একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে যেমন সাবলীলভাবে বক্তব্য রেখেছিলেন, টিভি বিতর্কে তাঁরা তেমন সাবলীল ছিলেন না। এটা শুধু আমার একার মনে হয়েছে তা নয়, রাতে গেস্ট রুমে এসে যখন কথা হচ্ছিল, বিতার্কিকরা নিজেরাও এটি স্বীকার করছিলেন এবং আমাদের টিমের কোচ হিসেবে যিনি এসেছিলেন তিনিও একই কথা বললেন। আমি বসে বসে তাঁদের কথা শুনছিলাম, তাঁদের বক্তব্যের সারমর্ম যা বুঝলাম, আমাদের বিতার্কিকদের যথেষ্ট প্রস্তুতি ও জানাশোনার পরেও মঞ্চে যে আত্মবিশ্বাস থাকা দরকার সেখানে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। যা আমাদের প্রতিপক্ষের বিতার্কিকদের মধ্যে ছিল না। আমাদের প্রতিপক্ষের বিতার্কিকরা বক্তব্যের মধ্যে কিছু ভুল তথ্য বললেও এতটা আত্মবিশ্বাসের সাথে তাঁরা উপস্থাপন করেছেন যে, বিচারকগণ তাৎক্ষণিকভাবে ওই তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে না পেরে তা সত্য হিসেবেই ধরে নিতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে আমাদের দলের দু-একজন বিতার্কিক জানা তথ্যগুলো বলতে গিয়ে প্রতিপক্ষের বক্তাদের আত্মবিশ্বাসের সামনে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে আমরাও যখন বিতর্ক করেছি, তখনও অনেক সময় এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি।
আমি বিতার্কিক ছিলাম বলে বিতর্ককে কেন্দ্র করে আলোচনা করলাম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা যারা ঢাকার বাইরে থেকে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করি, আমাদের আইনের শিক্ষার্থীদের প্রত্যেক ব্যাচের দু-চারজন ছাড়া অধিকাংশই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস তৈরিতে বিলম্ব হওয়ায় কর্মজীবনে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে যাই। তাই আমার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেই লক্ষ্য পূরণে পর্যাপ্ত চর্চার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস তৈরি না করা আইনের শিক্ষার্থীদের একটি ভুল।
আত্মবিশ্বাস মানে যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্ভার থাকা বা থাকতে পারা। আত্মবিশ্বাসের বাস্তব উদাহরণ আমরা শৈশবে শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস শ্রীকান্তে পড়েছি। সাহস-দুঃসাহস ও আত্মবিশ্বাসে ইন্দ্রনাথ আমাদের শৈশবের নায়ক ছিল। ঘটনাটা অনেকটা এরকম: ‘ইন্দ্রনাথ গভীর রাতে শ্রীকান্তকে সঙ্গে নিয়ে মাছ চুরি করতে গিয়েছিল। পথে ভয়ংকর সাপ দেখে শ্রীকান্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তখন ইন্দ্রনাথ অত্যন্ত নির্ভীকভাবে বলে, মরতে তো একদিন হবেই, তাই বলে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলে চলবে না। জীবনের ঝুঁকি ও মৃত্যুকে সে যেন খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছিল।’ কিন্তু আমরা সবাই সাহসে বা আত্মবিশ্বাসে ইন্দ্রনাথের মতো হতে পারব না, তাই এক্ষেত্রে আমি আপনাদের বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার ডেভিড বেকহামের সাক্ষাৎকার থেকে একটা অংশ তুলে ধরছি। ২০১৩ সালের ২৬শে মে সফলদের স্বপ্নগাঁথায় প্রথম আলো তাঁর একটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ প্রকাশ করে, যা তিনি ব্রিটিশ ম্যাগাজিন স্কয়ার-এ দিয়েছিলেন। সেখানে ডেভিড বেকহাম বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, চর্চাতেই আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আমি নিয়মিত ফুটবল প্র্যাকটিস করি। আমার প্র্যাকটিস দেখে আমার সন্তানেরা অবাক হয়। তাদের বলি, যেহেতু আমি পেশাদার ফুটবলার, তাই বেশি প্র্যাকটিস করি। সবসময় শুনতে হয়, আমি নাকি পৃথিবীর সেরা মিডফিল্ডার। কিন্তু ঈশ্বরের দোহাই, আমার থেকেও সেরা ফুটবলার অনেক দেখেছি।”
তিনি কী পরিমাণ চর্চা করতেন তা তাঁর বক্তব্যের প্রথম অংশে ফুটে ওঠে, তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমার আকর্ষণ ছিল ফুটবলের দিকে। ঘুম থেকে ওঠার পর ফুটবল সবসময় আমার সঙ্গে থাকত। এমনকি আমি স্কুলে গেলেও ফুটবল হাতে করে নিয়ে যেতাম। আমার মনে আছে, আমি অনেকবার ফুটবল নিয়ে ঘুমিয়েও গেছি। আশির দশকের শুরুর দিকের একটা স্মৃতি আমাকে বেশ নাড়া দেয়। আমরা থাকতাম দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের চিংফোর্ড এলাকায়। আমাদের বাড়ির পাশের মাঠের দেয়ালে একটি মাঝারি আকারের ছিদ্র ছিল। আমি ও আমার বন্ধুরা দিনের আলো না নেভা পর্যন্ত সেই দেয়ালের ফুটো লক্ষ করে কিকের পর কিক প্র্যাকটিস করতাম। মাঝেমধ্যে আমার বাবা টেড বেকহামও এই কিক-কিক খেলায় এসে যোগ দিতেন।”
আমরা আমাদের নিবন্ধের একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। আজকের লেখাটি বিতর্ক নিয়ে শুরু করলেও, এটি প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমি অনেক শিক্ষার্থী সম্পর্কে জানি যাঁরা লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার পরেও শুধু ভাইভাতে আত্মবিশ্বাসের অভাবে খারাপ ফলাফল করেছেন। তাই আইনের শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার পরামর্শ, জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যা যা করা দরকার সব করুন। যেখানে ত্রুটি আছে, তা দূর করার জন্য নিয়মিত চর্চা করুন। আত্মবিশ্বাস এমনভাবে তৈরি করুন যেন আপনি যা চাইছেন তা দেওয়ার জন্য পৃথিবী সবার সাথে শত্রুতা শুরু করে দেয়।
শেষ করছি আল্লামা ইকবালের বাল-এ-জিবরীল কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার অংশ দিয়ে, তিনি বলেন, “খুদী কো কর বুলন্দ ইতনা কে হর তাকদীর সে পহলে, খুদা বান্দে সে খুদ পুছে, বতা তেরি রজা ক্যা হ্যায়।” বাংলায়: “নিজেকে এমন উচ্চতায় উন্নীত করো যে, তোমার তাকদীর নির্ধারণের আগেই আল্লাহ নিজে বান্দাকে জিজ্ঞেস করেন, বল, তোমার ইচ্ছা কী?”
সকলের জন্য শুভকামনা রইল। (চলবে)
লেখক: আরিফুল ইসলাম সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান আইন ও বিচার বিভাগ, বিইউবিটি।
Leave a Reply