বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়। ভাই সম্ভবত তখন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। কিছুদিন পরে যখন শহীদ জিয়াউর রহমান হলে আবাসিক ছাত্র হিসেবে থাকতে শুরু করি, তখন দেখি ভাইও এই হলেরই আবাসিক ছাত্র। আসতে-যেতে দিনে দু-একবার দেখা হতো। বড় ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে দায়িত্ব পালন করেন।
শুরুতে বিষয়টি আমার কাছে খুবই ভালো লাগত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একজন শিক্ষার্থীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়। এতে নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি হয়, মানুষের সঙ্গে পরিচয় বাড়ে, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম। ভাই তার সাংগঠনিক কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি যতটা না বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তার চেয়ে অনেক বড় সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে নিজেকে মনে করতেন। ভাইকে মাঝে মাঝে দেখতাম সকাল থেকে রাত, কখনো অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি, কখনো মহড়া, কখনো সভা, কখনো নতুন সদস্য সংগ্রহ, কখনো পোস্টার, ব্যানার কিংবা কমিটির সদস্যদের নিয়ে ক্যাফেটিরিয়ায় সংগঠনিক বৈঠক করতে। অনেক সময় অনুষদের করিডোরে, হলের বারান্দায় কিংবা ক্যাফেটেরিয়ায় যেখানে যেতাম, কোনো না কোনো কাজে তাকে ব্যস্ত দেখতাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষার্থীরা তাকে খুব সম্মান করত। অনেকে তার নাম জানত, কিন্তু খুব কাছের ছাড়া অনেকেই জানতো না তিনি কোন বিভাগের ছাত্র, কোন বর্ষে পড়েন। তার ছাত্র পরিচয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠকের পরিচয়ই অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল।
এভাবে বছর তিনেক কেটে গেল।
একদিন জানতে পারলাম, ভাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে গেছে। কিছুদিন পরে ক্যাম্পাসেও আর তাকে দেখা যায় না। প্রায় বছরখানেক পর হঠাৎ একদিন কুষ্টিয়া শহরে ভাইয়ের সাথে দেখা। অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় কুশল বিনিময় করলাম। জানতে চাইলাম, ভাই এখন কী করছেন?
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ভাই, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছি আমি।”
আমি জানতে চাইলাম, কী ভুল?
তিনি বললেন, “আমি বুঝতেই পারিনি কখন ছাত্রজীবন শেষ হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন করছি, আনন্দ পাচ্ছি মানুষ সম্মান করছে এটাই আমার ভবিষ্যৎ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয়েরও অনেকটাই সমাপ্তি ঘটে গেল। এখন চাকরির পরীক্ষায় বসি, রেজাল্ট ভালো নয়। যেসব বন্ধু সারাক্ষণ লাইব্রেরিতে পড়ত, তাদের অনেকেই আজ বিভিন্ন পদে চাকরি করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে কিংবা আইনজীবী হিসাবে কাজ করছে। আর আমি এখন নতুন করে শুরু করতে চাইছি।”
তার কথাগুলো শুনে আমি কিছুক্ষণ নীরব ছিলাম।
আমার মনে হয়েছে, সমস্যাটা সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত হওয়া নয়। সমস্যা হলো, কখন থামতে হবে, সেটা না জানা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেক শিক্ষার্থী রাজনীতি, সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিতর্ক, রক্তদান কিংবা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়। এগুলোর প্রত্যেকটিরই মূল্য আছে। বরং এসব কার্যক্রম একজন শিক্ষার্থীকে নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস শেখায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের মূল পরিচয় একজন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের শুধু সংগঠক বানানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি; প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলী অর্জন করা। সংস্কৃতিক সংগঠন হবে পড়াশোনার সহযাত্রী, বিকল্প নয়।
আমি বহু শিক্ষার্থীকে দেখেছি, প্রথম বর্ষে সংগঠনের সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে। দ্বিতীয় বর্ষে কমিটির সদস্য হয়েছে। তৃতীয় বর্ষে পদ পেয়েছে। চতুর্থ বর্ষে এসে পুরো সংগঠনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। এর মধ্যে কখন যে সিজিপিএ কমে গেছে, বার কাউন্সিলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি, বিচার বিভাগ বা বিসিএসের সিলেবাস একবারও দেখা হয়নি, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় শেষ হয়ে গেলে অধিকাংশ সংগঠনেই নতুন নেতৃত্ব আসে। নতুন প্রজন্ম দায়িত্ব গ্রহণ করে। তখন অনেকেই উপলব্ধি করে, যে পরিচয়টিকে জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ভেবেছিল, সেটি আসলে ছাত্র পরিচয়ের উপরই দাঁড়িয়ে ছিল। এখানেই একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা হলো, সময়মতো থামতে জানা।
আমরা সবাই নদীতে নৌকা চালানোর গল্প জানি। একজন দক্ষ মাঝি শুধু নৌকা চালাতেই জানেন না, কখন বৈঠা টেনে তুলতে হবে, কখন নোঙর ফেলতে হবে, সেটাও জানেন। সারাক্ষণ বৈঠা চালাতে থাকলে নৌকা যেমন গন্তব্যে পৌঁছায় না, তেমনি জীবনের প্রতিটি কাজেরও একটি নির্দিষ্ট সময় আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে অবশ্যই যুক্ত হোন। নেতৃত্ব দিন, মানুষের জন্য কাজ করুন, অভিজ্ঞতা অর্জন করুন। কিন্তু কখন আপনার পড়াশোনা, ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, সেটাও বুঝতে শিখুন। কারণ একজন সফল সংগঠক হওয়ার চেয়েও একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জীবনের প্রতিটি যাত্রায় চলতে জানার মতোই থামতে জানাটাও একটি বড় প্রজ্ঞা। সময়মতো সরে আসতে না পারলে অনেক সময় যে পরিচয়কে সবচেয়ে বড় অর্জন মনে হয়, সেটাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়ে দাঁড়ায়।
সকলের জন্য শুভকামনা রইল।
(চলবে)
আরিফুল ইসলাম
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
আইন ও বিচার বিভাগ, বিইউবিটি।
Leave a Reply